লেখক: এম. আরিফুল ইসলাম চৌধুরী
রোদের সোনাঝরা আলোয় ঝিলমিল করে ওঠা উন্মুক্ত নীল জলরাশি আর দীর্ঘ ধূসর তটরেখার এক অনবদ্য মেলবন্ধন প্রকৃতি আমাদের উপহার দিয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক ঈর্ষণীয় সম্পদ। প্রায় ১২০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকত হিসেবে কক্সবাজার কেবল বাংলাদেশের রূপসী ভূখণ্ডের কোনো আলংকারিক ভূষণ নয়; বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির এক সুপ্ত, অফুরন্ত ও টেকসই সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—প্রকৃতির এই অনন্য দানকে আমরা কতটা হৃদয়ে ধারণ করতে পেরেছি, কিংবা কতটুকুই বা সঠিক কৌশলে কাজে লাগাতে পেরেছি?
সম্প্রতি পর্যটনকেন্দ্রে প্যারাসেলিং দুর্ঘটনায় পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো আমাদের গভীরভাবে ব্যথিত, ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করে। এসব ঘটনা পর্যটনসেবা খাতে গাফিলতি, নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। মাঝেমধ্যেই ভ্রমণপিপাসুদের মুখে একটি হতাশাজনক আক্ষেপ শোনা যায়—“কক্সবাজারে সমুদ্রের নোনা জল আর কংক্রিটের জঙ্গল ছাড়া আর কী-ই বা আছে!”
এই আক্ষেপ কেবল ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি আমাদের অপরিকল্পিত বাণিজ্যিকীকরণ, সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ঘাটতির প্রতিফলন। প্রকৃতির এই অনবদ্য আশীর্বাদকে টেকসই রূপ দিতে এবং কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাব হিসেবে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে এখন প্রয়োজন বহুমুখী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা।
১. যোগাযোগের নতুন দিগন্ত: আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ও অর্থনৈতিক করিডোর
কক্সবাজারকে ঘিরে দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। তবে এটি কেবল মহা-সম্ভাবনার সূচনা। এ সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে কয়েকটি ক্ষেত্রে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ট্রানজিট ও রিফুয়েলিং হাব: সমুদ্রের কোলঘেঁষে বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার আকাশপথের অন্যতম রিফুয়েলিং ও ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ামুখী দূরপাল্লার ফ্লাইটগুলো রিফুয়েলিংয়ের জন্য এখানে অবতরণ করলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সরাসরি কক্সবাজারে আসার সুযোগও বাড়বে।
রেল যোগাযোগের নবযুগ ও আঞ্চলিক সংযুক্তি: রাজধানী ঢাকা থেকে পর্যটন নগরী কক্সবাজার পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় যাতায়াত আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হয়েছে। তবে এই নেটওয়ার্ককে শুধু যাত্রীবাহী ট্রেনে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্গো ও ফ্রেইট সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে বান্দরবান ও রাঙামাটির মতো পার্বত্য এলাকার সঙ্গে সমন্বিত পাহাড়ি-উপকূলীয় পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
ক্রুজ ট্যুরিজম ও ব্লু-ওয়াটার নেটওয়ার্ক: কক্সবাজার থেকে মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সেন্টমার্টিন এমনকি দেশের অন্যান্য উপকূলীয় পর্যটনকেন্দ্র পর্যন্ত ক্রুজ ও ওয়াটার ট্যাক্সি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের মেরিনা তৈরি করে বিদেশি ইয়ট ও প্রমোদতরী আকর্ষণ করতে পারলে সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
২. বাস্তুতন্ত্র, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো
প্রকৃতিকে আঘাত করে কোনো পর্যটনশিল্প দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। অনিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মাণ, পাহাড় কাটা, ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলন ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে কক্সবাজারের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।
পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম ও কঠোর আইন প্রয়োগ: উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। মেরিন ড্রাইভ ঘেঁষে সুনির্দিষ্ট উচ্চতা ও স্থাপত্যনীতির ভিত্তিতে পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট গড়ে তোলা যেতে পারে। পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত বহুতল ভবন নির্মাণ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ: সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় প্রতিটি হোটেল-রিসোর্টে যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য শোধনব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন: লাল কাঁকড়ার বিচরণক্ষেত্র, তটরেখার প্রাকৃতিক ঝাউবন, ম্যানগ্রোভ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে প্রকৃতির নিজস্ব ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ক্ষয় মোকাবিলায় কৃত্রিম অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ ও ঝাউবন সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
৩. নিরাপত্তা, আধুনিকায়ন, নাইটলাইফ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
শুধু সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করাই আধুনিক পর্যটনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। দেশি-বিদেশি পর্যটকেরা নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মানের বিনোদন এবং নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য প্রত্যাশা করেন।
নিরাপত্তা, সেফটি প্রোটোকল ও সিন্ডিকেট দমন: পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা যেতে পারে। প্যারাসেলিং, জেট স্কি, সার্ফিং ও স্কুবা ডাইভিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস পরিচালনায় মানসম্মত নিরাপত্তা সরঞ্জাম, নিয়মিত যন্ত্রপাতি পরীক্ষা এবং প্রশিক্ষিত প্রশিক্ষক নিশ্চিত করা জরুরি।
পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও সিন্ডিকেট বন্ধে কিউআর কোডভিত্তিক নির্ধারিত মূল্যতালিকা এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
নিরাপদ নাইটলাইফ ও কালচারাল ট্যুরিজম: নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নির্দিষ্ট পর্যটন জোনে লাইভ মিউজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কালচারাল সেন্টার ও লাইট-অ্যান্ড-সাউন্ড শোর আয়োজন করা যেতে পারে। পাশাপাশি কক্সবাজারের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বিশেষ করে রাখাইন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং স্থানীয় খাবার—সি-ফুড ও শুঁটকিভিত্তিক ফুড ট্যুরিজম—বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ডিজিটাল ট্যুরিজম ইকোসিস্টেম: একটি সমন্বিত ‘কক্সবাজার স্মার্ট অ্যাপ’ চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পর্যটকেরা হোটেল বুকিং, ই-টিকিটিং, লাইভ বিচ ট্রাফিক, আবহাওয়ার তথ্য, জরুরি এসওএস সুবিধা এবং স্থানীয় দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে পেতে পারেন।
৪. ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির স্বর্ণদুয়ার
বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে পর্যটন খাত হতে পারে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে ‘ব্লু ইকোনমি’র বহুমুখী সুযোগ উন্মোচন করা সম্ভব।
বিলাসিতা ও বিকল্প পর্যটনের প্রসার: কেবল সৈকতকেন্দ্রিক পর্যটনের ওপর নির্ভর না করে মেরিন স্পা, এমআইসিই (MICE—Meetings, Incentives, Conferences and Exhibitions) ট্যুরিজম এবং স্পোর্টস ট্যুরিজমের প্রসার ঘটানো যেতে পারে। সার্ফিং, বিচ ভলিবলসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের মাধ্যমে সারা বছর পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব।
স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষমতায়ন: পর্যটনশিল্পের সুফল যেন শুধু বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকে নজর দিতে হবে। স্থানীয় হস্তশিল্পী, মৎস্যজীবী ও রাখাইন তাঁতিদের সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজম’ গড়ে তুলতে হবে। এতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে এবং তারা পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নেবে।
জিডিপিতে বড় অবদানের সম্ভাবনা: সঠিক অবকাঠামো, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটনবান্ধব নীতির সমন্বয় ঘটাতে পারলে পর্যটন খাতের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। এর ফলে নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাও আরও সম্প্রসারিত হবে।
সম্ভাবনা বাস্তবায়নে নতুন ভোরের অপেক্ষা
সমুদ্রের অফুরন্ত জলরাশির মতোই কক্সবাজারের সম্ভাবনাও অসীম। ‘শুধু পানি আর দালানকোঠা’ দেখার গতানুগতিক অভিজ্ঞতা থেকে পর্যটকদের বের করে এনে একটি অনন্য, নিরাপদ, রোমাঞ্চকর ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা দেওয়ার সময় এখনই।
কক্সবাজার কেবল একটি শহরের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। প্রকৃতির এই অনন্য দানকে ভালোবেসে সুসংহত ব্যবস্থাপনা, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও কাঠামোগত রূপান্তর নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজার শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, সমগ্র বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে অন্যতম সেরা ও দায়িত্বশীল গন্তব্য হিসেবে স্থান করে নিতে পারে।
নীতিনির্ধারক, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের সচেতন, সুসংগঠিত ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমেই উন্মোচিত হতে পারে কক্সবাজারের সম্ভাবনার এই নতুন স্বর্ণদুয়ার।
